সুশাসন ছাড়া গণতন্ত্র ও উন্নয়ন উভয়ই অকার্যকর

মোঃ মিজানুর রহমান সহযোগী অধ্যাপক ।সরকার ও রাজনীতি বিভাগ । শান্ত-মারিয়াম ইউনিভার্সিটি অব ক্রিয়েটিভ টেকনোলজি।সুশাসন ছাড়া যেমন গণতন্ত্র পূর্ণাঙ্গভাবে সুরক্ষা করা যায় না, তেমনি গণতন্ত্র না থাকলে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা যায়না।গণতান্ত্রিক পদ্ধতি ব্যতিরেকেও রাষ্ট্রনায়কগ ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়ে দেশ শাসন এবং উন্নয়ন করতে পারেন। তবে সে উন্নয়ন সুসম, জবাবদিহিমূলক ও টেকসই হয় না। তৃতীয় বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশগুলোতে প্রায়ই বিতর্ক লক্ষ্য করা যায় যে- একটি দেশের সাধারণ মানুষের সর্বোত্তম কল্যাণ সাধনের জন্য গণতন্ত্র ও উন্নয়ন এ দুটির মধ্যে কোনটি বেশি জরুরি? গণতন্ত্রের প্রবক্তারা মনে করেন একমাত্র নির্ভেজাল গণতন্ত্রই একটি দেশের কার্যকর অর্থনৈতিক উন্নয়ন ত্বরাণ্বিত ও নিশ্চিত করতে পারে। কোন দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত করতে হলে চূড়ান্ত পর্যায়ে সে দেশের সার্বিক কল্যাণ সাধিত হতে বাধ্য। সবার আগে চাই গণতন্ত্র। তাই গণতন্ত্রের ধারাবাহিকতা রক্ষা করতে হবে। গণতন্ত্রের ধারাবাহিকতা থাকলে একটি দেশের অর্থনৈতিক উন্নতি অর্জন কঠিন কিছু নয়। তারা আরো মনে করেন গণতন্ত্রের মাধ্যমেই একটি দেশ ও সমাজ দ্রুত এগিয়ে যেতে পারে। তাই গণতন্ত্রের কোনো বিকল্প নেই।

তারা সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতির উদাহরণ টেনে বলতে চান, সমাজতন্ত্র বা অন্য কোনো অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় সর্বোচ্চ কল্যাণ সাধন হতে পারে না। সমাজতান্ত্রিক অর্থব্যবস্থা ব্যক্তির সৃজনশীলতাকে বাধাগ্রস্ত করে। কারণ সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থায় উৎপাদন প্রক্রিয়া পরিচালিত হয় রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে। ব্যক্তির স্বাধীনতা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা সেখানে সীমিত। অন্যদিকে গণতন্ত্র ও মানুষের ব্যক্তিগত সৃজনশীলতাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব প্রদান করে।

অর্থনীতিতে নোবেল বিজয়ী অমর্ত্য সেন গণতন্ত্র প্রসঙ্গে তিনি কথা বলেছেন। প্রথমত, গণতন্ত্র সমুন্নত রাখতে হলে ব্যক্তি স্বাধীনতাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। দ্বিতীয়ত, গণতন্ত্র কতটা উৎকর্ষ লাভ করল, সে বিতর্কে না গিয়ে এর বিকাশের প্রতি নজর দেওয়া জরুরি। তৃতীয়ত, গণতন্ত্রের আলোচনা ছাড়া কিছুই সম্ভব নয়। এটি তার কোন নতুন দৃষ্টিভঙ্গি নয়, গণতন্ত্র ও উন্নয়ন সম্পর্কে এতদিনকার সুচিন্তিত অভিমত ব্যক্ত হয়েছে মাত্র। বাংলাদেশ সফরে এসে তিনি এ কথা বলেন। অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও মানবিক প্রগতি বক্তৃতায় তার প্রদত্ত মন্তব্য আমাদের সমকালীন রাজনীতি বিচারের দাবি রাখে বটে, তা হলো মানবিক প্রগতি ও অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রা মধ্যে একটি দ্বান্দ্বিকতা সম্পর্ক রয়েছে। তাই বলে কেবল প্রগতি বা উন্নয়ন দেখিয়ে মানবিক প্রগতিকে দুর্বল করা গ্রহনযোগ্য হবে না। আগে গণতন্ত্র না উন্নয়ন এই তর্ক থেকে অমর্ত্য দর্শনের গুরুত্ব যোজন যোজন।

আজকাল আমাদের দেশে কিছু ব্যক্তি বিশেষত রাজনীতি ও সংশ্লিষ্ট বুদ্ধিজীবীরা বলেন, আগে উন্নয়ন পড়ে গণতন্ত্র। এদের কথা শুনে মনে হচ্ছে অর্থনৈতিক উন্নয়ন আর গণতন্ত্র যেন পরস্পরের সাথে সাংঘর্ষিক ‌ কিন্তু ইতিহাসটা বলেনা। বর্তমানে যেসব রাষ্ট্রকে বলা হচ্ছে অর্থনৈতিক দিক থেকে উন্নত, তারা অধিকাংশই হলো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র। অর্থনৈতিক উন্নয়ন আর গণতন্ত্র পরস্পরবিরোধী হলে এটা কখনোই হতে পারত না ‌সুশাসন না থাকলে সমাজের বিভিন্ন স্তরে বিশৃঙ্খলা দেখা দিতে পারে। দুর্নীতি ও অপরাধ বেড়ে যেতে পারে।মালয়েশিয়াতে সুশাসনের সমস্যা দেখা দিলে মাহাথির মাহমুদ 92 বছর বয়সে ন্যাশনাল জোট (উল্লেখ্য যে নিজেই জোটে ১৯৮১-২০০৩সাল পর্যন্ত দীর্ঘ 22 বছর ক্ষমতায় ছিলেন) বিরুদ্ধে ভোটে দাড়িয়ে পাকাতান হারাপান নামের জোটের পক্ষ থেকে জয়লাভ করে সরকার গঠন করে দেশ কে আবার পূর্বের সুশাসন অবস্থা নিয়ে যাবেন বলে অনেকে মনে করেন এবং যাচ্ছেন তিনি তাই। বর্তমানে আমাদের সমাজ ব্যবস্থার দিকে তাকালে আমরা কি দেখতে পাই ? সরকার নানাভাবে সমাজে এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সুশাসন প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে সুশাসন প্রতিষ্ঠার তাগিদ দেয়া হলো তৃণমূল পর্যায়ের প্রতিষ্ঠানগুলোতে কার্যকর সুশাসন প্রতিষ্ঠার না হয় অবস্থার দৃশ্যমান কোনো উন্নতি হচ্ছে না ‌ এ ক্ষেত্রে সাফল্য যতটা অরিজিত হওয়া উচিত ছিল তা হচ্ছে না। একটি আন্তর্জাতিক সংস্থা কিছুদিন আগে বলেছে, প্রতিবছর দুর্নীতির কারণে বাংলাদেশে আড়াই থেকে তিন শতাংশ জিডিপি অর্জন থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত বিপুল পরিমাণ টাকা প্রতি বছর দেশের বাইরে পাচার হয়ে যাচ্ছে। অথচ এসব টাকা যদি স্থানীয়ভাবে বিনিয়োগ হত তাহলে অর্থনৈতিক উন্নয়ন অনেকটাই ত্বরাম্বিত হতে পারত। রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত বিশেষত প্রতিষ্ঠানগুলোর অধিকাংশেই সুশাসনের অভাব রয়েছে। ফলে প্রতিষ্ঠানগুলোর যে মাত্রায় জন্ সেবা প্রদান করার কথা ছিল তারা তা দিতে পারছে না। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ নির্বাহী পর্যায় থেকে যতই স্বচ্ছতার কথা বলা হোক না কেন, প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন নিশ্চিত করা না গেলে কোন কাজ হবে না

উদার গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় মানুষ সবচেয়ে অধিক ব্যক্তি স্বাধীনতা ভোগ করতে পারে। গণতন্ত্র উন্নত জীবন ব্যবস্থা ‌ কারন মানুষ এখানে হয় না রাষ্ট্রযন্ত্রের দাস। বলতে পারে তার আপন দাবি-দাওয়ার কথা। নিয়ন্ত্রিত করতে পারে তার আশা-আকাঙ্ক্ষা অনুসারে রাষ্ট্রকে। গণতন্ত্র নিজেই হলো উন্নয়নের একটি মাপকাঠি। অর্থাৎ সে নিজেই একটি লক্ষ্য। অন্য কোন লোকের মাপকাঠি দিয়ে তার বিশাল প্রচেষ্টা অসম্ভব। মানুষের কোন কিছু নিখুঁত নয়। বিলাতের রাজনৈতিক স্যার উইনস্টন চার্চিল (১৮৭৪–১৯৬৫) একবার বলেছিলেন, উদার গণতন্ত্রের গলদ আছে অনেক। কিন্তু মানুষ রাজনৈতিক ব্যবস্থা হিসেবে এখন পর্যন্ত এর চেয়ে ভালো কিছু আবিষ্কার করতে পারেননি।
গণতন্ত্রের সূর্যের মতো সর্বব্যাপী। রাসতে প্রকৃত গণতন্ত্র থাকলে শাসন, সুবিচার, উন্নয়ন, জবাবদিহিতা, মত প্রকাশের স্বাধীনতার সবই থাকে ও বিকশিত হয়। তবে উন্নয়নের জন্য যখন গণতন্ত্রকে বাদ দেয়ার কথা বলা হয় তখন বিশেষ কিছু মতলব প্রকাশ পায়। গণতন্ত্র ও উন্নয়নের অন্তরায় নয়। তাহলে গণতন্ত্র উন্নয়ন এবং তার মতলবটা কি? গণতন্ত্র না থাকলে ও উন্নয়ন হতে পারে। সাদ্দাম হোসেনের ইরাক ও গাদ্দাফি লিবিয়ার সহ পৃথিবীর কিছু দেশের এমনটি হয়েছে।

তাই বলে কি স্বৈরশাসক জিন্দাবাদ বলতে হবে?আমরা দেখেছি সাদ্দাম হোসেন ও গাদ্দাফির পতনের পর ওই রাষ্ট্র দুটি আজ অব্দি একটি ব্যর্থ ও অকার্যকর রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে কারণ তারা গণতন্ত্রকে প্রাধান্য না দিয়ে অর্থনীতিকে প্রাধান্য দিয়েছিল যার ফলে তাদের পতন এর সাথে সাথে তাদের অর্থনৈতিক অবকাঠামো ধুলায় লুটিয়ে গিয়েছে এর সাথে আমরা দেখতে পাই যে সমস্ত রাষ্ট্রগুলিতে টেকসই উন্নয়ন হয়েছে সে সমস্ত রাষ্ট্রগুলি সর্বপ্রথম গণতন্ত্র উন্নয়ন ঘটেছে কারণ গণতন্ত্র দিতে পারে একমাত্র টেকসই উন্নয়ন যা আমরা আমেরিকা কানাডা ইউরোপীয় দেশগুলোতে দেখতে পায়।উন্নয়ন যদি একটি দৈহিক ব্যাপার হতো তাহলে গণতন্ত্র সে দেহের মনন চেতনা সভ্যতা ও সংস্কৃতি। প্রয়োজনীয় পুষ্টি পেলেই একটি দেহ শক্তি সামর্থ্য হবে। তাই বলে কি মানব সন্তান সভ্যতা ও সংস্কৃতি বাদ দিয়ে শুধু শরীরের পুষ্টির দিয়েই ভাববে ? গণতন্ত্রের কারণে উন্নয়ন হয় না এমন একটি দর্শনের আবিষ্কার ও সেই দর্শনের পক্ষে মতামত গঠনের চেষ্টা প্রকৃতপক্ষে স্বৈরতন্ত্রের পক্ষে অবস্থান নেওয়া ছাড়া কিছুই নয়।

কোন দেশ যদি সত্যিকার অর্থে টেকসই উন্নয়ন সাধন করতে চাই, তাহলে তাকে প্রথমেই সর্বস্তরের সুশাসন প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিতে হবে। কারণ সুশাসন না থাকলে একটি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও গণতন্ত্র বিপর্যস্ত হতে পারে। তাই সবার আগে একটি দেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করাই সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। উন্নয়ন ও গণতন্ত্রের সঙ্গে সুশাসনের কোনো বিরোধ নেই। বরং গণতন্ত্র ও উন্নয়নকে টেকসই এবং অধিকতর কার্যকর করতে হলে সুশাসনের হাত ধরে চলতে হবে। সুশাসন ছাড়া উন্নয়ন ও গণতন্ত্র পৃথকভাবে জনকল্যাণ সাধন করতে পারে না। তাই উন্নয়ন ও গণতন্ত্রকে সুশাসনের সঙ্গে হাত ধরাধরি করে চলতে হয়।

About Company

Subscribe Newsletter

Sign up for our latest news & articles. We won’t give you spam mails.