সমসাময়িক বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্ব

সমসাময়িক বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্ব

অধ্যাপক এম. মিজানুর রহমান
সরকার ও রাজনীতি বিভাগ।
শান্ত – মারিয়াম ইউনিভার্সিটি।

বাংলাদেশ কৌশলগত দিক থেকে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক শক্তিমত্তা কেমন বলার কারণ হলো একটি দেশের কৌশলগত ও স্ট্যাটিসটিকস হিসেবে। যেমন সিঙ্গাপুর ভূকৌশলগত দিক বিবেচনা করে সে দেশের রাজনৈতিক নেতারা দেশকে কাজে লাগিয়ে দেশের অর্থনীতিকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছেন। মধ্যপ্রাচ্যসহ এমন অনেক রাষ্ট্রকে আমরা দেখতে পাই ভূ-কৌশলগত দিক কাজে লাগিয়ে তারা আজ পৃথিবীর ভিতরে উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। বর্তমানে তেমনি বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার একটি অন্যতম ভূকৌশলগত রাজনৈতিক গুরুত্ব পূর্ণ দেশ। বিশ্বের শক্তিধর রাষ্ট্র গুলো আমাদের এই ভূমিকে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে ব্যবহার করার জন্য প্রবল চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
মাত্র দুটি দেশের সাথে বাংলাদেশের সীমান্ত সম্পর্ক রয়েছে, ভারতের সাথে 4156 কিলোমিটার ও মায়ানমারের সাথে 271 কিলোমিটার। এই দুটি দেশের সাথে আমাদের বাস্তব ক্ষেত্রে দেখা যায় কখনও সম্পর্ক মধুর নয়। রাজনৈতিক ও সামরিক দিক থেকে দক্ষিণ এশিয়া পৃথিবীর মধ্যে উত্তপ্ত অঞ্চল যেকোনো মুহূর্তে যুদ্ধ লেগে যেতে পারে। কারণ পৃথিবীর স্বীকৃত সাতটি পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্র গুলির মধ্যে তিনটি রয়েছে এ অঞ্চলে।
যেমন চায়না পাকিস্তান ও ভারত এবং এই তিনটি দেশের মধ্যে সীমান্ত সংঘর্ষ রয়েছে এবং যুদ্ধ হয়েছে কয়েকবার। বাংলাদেশ পৃথিবীর তৃতীয় মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ এবং এশিয়ার মধ্যে দ্বিতীয়। বর্তমানে বাংলাদেশের জনসংখ্যার 65 শতাংশ যুবক যাদের বয়স 40 বছরের নিচে এবং এটিকে বলা হয় একটি দেশের যৌবন এবং শত বছরে একবার এভাবে একটি রাষ্ট্রের যুবক শ্রেনিদের দেখা যায় রাষ্ট্র এই যুবক শ্রেণীকে কাজে লাগিয়ে দেশকে দ্রুত উন্নতি করতে পারে যা আমরা জাপানের ক্ষেত্র দেখেছিলাম। শত্রুভাবাপন্ন তিনটি পরমাণু শক্তিধর দেশ আমাদের নিকট প্রতিবেশী সেই সাথে মায়ানমার আমাদের সাথে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন ধরনের সমস্যা করে চলছে। এই দেশটি কখনোই বাংলাদেশের বন্ধুরাষ্ট্র নয়। মায়ানমার রোহিঙ্গা শরণার্থী দিয়ে আমাদের প্রায় সমস্যা লাগিয়ে রাখছে , সমুদ্র সমস্যা সেই সাথে মাঝে মাঝে আমাদের সবচেয়ে দৃষ্টিনন্দন দ্বীপটি সেন্টমার্টিনকে তাদেরই সীমানায় দেখাচ্ছে যা খুবই চিন্তার বিষয়। afro-asian দেশ ভারত যার ফলে ভূকৌশলগত দিক থেকে ভারত তার পার্শ্ববর্তী দেশ বাংলাদেশ নেপাল ভুটান ও শ্রীলংকাকে সবসময় কৌশলগত কারণে তাদের কাছে রাখতে চাই।
2000 সালে নেপালের রাজ পরিবারের পতনের পর ভারতের কর্তৃত্ব আস্তে আস্তে কমতে থাকে বর্তমানে চায়নার সরকার পুরোটাই নেপালের কর্তৃত্ব তাদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নিয়েছে এবং নেপালি জনগণ ইন্ডিয়ান টিভি মিডিয়া ও পণ্য সবকিছুই বর্জন করে চলছে। ভুটান ও শ্রীলঙ্কা বর্তমানে পুরোপুরি চায়নার কব্জায়। যার ফলে এই মুহূর্তে ভারতের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমি হলো বাংলাদেশের ভূমি। কিন্তু এখানেও যদি চায়না অর্থনৈতিক রাজনৈতিক ও সামরিক প্রভাব বিস্তার করে ফেলে তাহলে চায়না তার পলিসি বাস্তবায়ন সহজ হয়ে যায়। কারণ চায়না ভারতকে চতুর্দিক থেকে ঘিরে ফেলার নীতি গ্রহণ করে চলছে বিশেষ করে গত জুনে লাদাখ সীমান্তে চায়না সেনাবাহিনীর হাতে ভারতীয় সেনাবাহিনী মৃত্যুর পর থেকে। এখানে বলা যায় যে পাকিস্তান জাতিগতভাবে দিল্লির বিরোধী তাহলে কি দাঁড়ালো ? বাংলাদেশ যদি এই কাতারে চায়নার সাথে যোগদান করে তাহলে ভারতের পাশ আর কেউ রইল না।
আঞ্চলিক গণ্ডি ছাড়িয়ে বিশ্ব রাজনীতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে,বিশ্ব তৎকালীন শীতল যুদ্ধের সময় এর মত আবার দুই ভাগে ভাগ হয়ে গেছে।একদিকে আছে চায়না-পাকিস্তান উত্তর কোরিয়া ইরান তুরস্ক রাশিয়া সহ অন্যান্য রাষ্ট্র এবং অপরদিকে আছে আমেরিকা-ভারত জাপান অস্ট্রেলিয়া ইসরাইল ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের কিছু রাষ্ট্র।

এই প্রেক্ষাপটে আমেরিকা চেয়েছিল ভারতের মাধ্যমে দক্ষিণ এশিয়ার রাষ্ট্রগুলি কে নিয়ন্ত্রণ করতে কিন্তু এখানেও আমেরিকা ও ভারত ব্যর্থ, এই দুই পক্ষের মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশ।ভারত আমাদের কাছের প্রতিবেশী রাষ্ট্র হলেও বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে তেমন কোন অবদান রাখতে পারে নাই যে অবদান রাখতে পারছে চায়না, বর্তমানে বাংলাদেশের ভূ রাজনীতির যে অবস্থা বাংলাদেশের ইচ্ছা করলেই চায়নাকে বাদ দিয়ে দিল্লি দরবারে হাজির হতে পারবে না,অতি সম্প্রতি আমরা দেখেছি তিস্তা নদী নিয়ে চায়না বাংলাদেশের চুক্তির কথা চলা অবস্থায় ভারতের পররাষ্ট্র সচিব হর্ষবর্ধন শ্রিংলা বাংলাদেশের ঝটিকা সফরে এসেও বাংলাদেশের কাছ থেকে তেমন কোনো সদুত্তর পায়নি বলে আমরা মনে করি। আবার বঙ্গোপসাগরে রয়েছে বিশাল অর্থনৈতিক সম্ভাবনা এবং সামরিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ এক পজিশন, চায়না যদি ভারতের সাথে কোন যুদ্ধে বঙ্গোপসাগরের যুদ্ধজাহাজ বা সাবমেরিন মোতায়েন করতে পারে তাহলে ভারতের জন্য দুঃস্বপ্নের কারণ হয়ে যাবে, কিংবা আমেরিকা যদি চায়নার সাথে কোন যুদ্ধে জড়িয়ে যাই তাহলে বঙ্গোপসাগর থেকে চায়না সাউদার্ন রিজনে এখান থেকে আক্রমণ করতে পারবে অথবা ভারত যদি নিঃশর্তভাবে বাংলাদেশের ভূমি ব্যবহার করতে পারে তাহলে তাদের সেভেন সিস্টার রাজ্যগুলির বিচ্ছিন্ন কামিদের সহজে দমন করতে পারবে।

তাই ভারত চাইবে যেকোনো মূল্যে বাংলাদেশের ভূমিকে নিজেদের করাতো রাখতে। এই মুহূর্তে রাশিয়ার জন্যও বাংলাদেশ আরো গুরুত্বপূর্ণ কারণ ঢাকার ওপর যদি রাশিয়ার প্রভাব থাকে তাহলে মস্কো ভারত-পাকিস্তান চায়নার উপর কিছু না কিছু প্রভাব রাখতে পারবে। আমরা জানি আমেরিকার অর্থনৈতিক অবকাঠামো শক্ত অবস্থানে থাকে অস্ত্র ব্যবসার উপর নির্ভর করে তাই বাংলাদেশকে চীনের প্রভাব থেকে মুক্ত করার জন্য আমেরিকা বাংলাদেশকে ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্যাটিস্টিক বিবেচনা করে রেখেছে গত 14 থেকে 16 অক্টোবর ঢাকা সফরে আসেন মার্কিন উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী স্টিফেন বিগান তিনি এ অঞ্চলের ভূ-রাজনীতি কৌশল বিশ্লেষণ করে বর্তমানে বাংলাদেশের উপরে তাদের প্রভাব বিস্তার করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন তারই প্রেক্ষিতে তিনিঘোষণা করেছেন বাংলাদেশ ও ইউএসএ সরাসরি বিমান চালানোর বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হবে অতিসম্প্রতি।

এরই পাশাপাশি আমেরিকা তাদের ফরেনপলিসির নতুন কৌশল হিসাবে সে দেশের বিভিন্ন কোম্পানিগুলোকে বাংলাদেশ জ্বালানি ওষুধ ও আইটি খাতে বিনিয়োগ করার জন্য বিবেচনা করতে বলছেন।
এ তো গেল সামরিক দিক, অর্থনৈতিক দিক থেকেও বাংলাদেশ একটি মহাগুরুত্বপূর্ণ দেশ। বাংলাদেশ ভারতের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে গত তিন বছরে ভারতীয়রা বাংলাদেশের চাকরি করে 30 হাজার কোটি রুপি নিয়ে গেছে, অন্যদিকে ভারতের টিভি চ্যানেলগুলোর সবচেয়ে বড় বাজার হলো বাংলাদেশ। ওদের বিভিন্ন স্যাটেলাইট চ্যানেলের 80% শুধু বাংলাদেশি , অনেক ছোট মাঝারি কোম্পানি বাংলাদেশে পণ্য বিক্রি করে, মোদ্দাকথা বছরে ভারত-বাংলাদেশ থেকে 1 লক্ষ কোটি কামি নিয়ে যায় ভারত-বাংলাদেশ রফতানি করে বছরে 10 বিলিয়ন ডলার কিন্তু ভারত বাংলাদেশ থেকে প্রতিবছর আমদানি করে মাত্র 400 মিলিয়নের কম অর্থাৎ লাভের পাল্লা ভারতের দিকেই বেশি।এই লাভের গুড় ভারত যেকোনো মূল্যে ধরে রাখতে চাইবে।
অন্যদিকে চায়না বাংলাদেশ এক্সপোর্ট করে প্রায় 11 বিলিয়ন ডলার কিন্তু আমদানি করে 808 মিলিয়ন থেকে সামান্য কিছু বেশি এখানেও চায়না লাভবান। রাশিয়া মূল ইনকাম সামরিক অস্ত্র বিক্রি থেকে তবে বর্তমানে সেটা বেড়েছে নিউক্লিয়ার পাওয়ার সেট আপ এর মাধ্যমে। যেকোনো সামরিক পজিশনের মূল উদ্দেশ্য থাকে অর্থনৈতিক রাষ্ট্রীয় কাঠামোর অখণ্ডতার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য। ভারতের জন্য উভয় ক্ষেত্রে খুবই গুরুত্বপূর্ণ, বাংলাদেশকে চায়নার দরকার স্ট্যাটিসটিকস কারণে কিন্তু দুঃখের বিষয় এদেশে দুই এক জন গুরুত্বপূর্ণ নেতা ছাড়া এগুলো কেউ উপলব্ধি করতে পারেনি । কেউ বাংলাদেশের ভূমি কাজে লাগানো তো দূরের কথা বুঝতেই পারিনি আবার যদি কেউ বুঝতে পারলেও ভূ-রাজনীতিকে কাজে লাগিয়ে দেশকে উন্নতি করার পরিবর্তে ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্যই বাংলাদেশের ভূমিকে ব্যবহার করেছেন। তবে বাংলাদেশ ভূ-রাজনৈতিক ভাবে গুরুত্বপূর্ণ অন্যতম একটি দেশ।এদেশের মুসলিম জনসংখ্যা যুবসমাজ ভূকৌশলগত অবস্থান প্রাকৃতিক সম্পদ ও বঙ্গোপসাগরের অবস্থান ও সব রকমের সামগ্রিক বিবেচনায় আমরা যদি আমাদের ভূমিকে সঠিকভাবে ব্যবহার করতে পারি তাহলে খুব দ্রুতই বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অবকাঠামো উন্নয়ন করা সম্ভব।
কিন্তু বর্তমান মুশকিল হল ভারত সরকার বাংলাদেশ থেকে যদি অতিরিক্ত সুযোগ-সুবিধা আদায় করতে না পারে তাহলে মিয়ানমারের মাধ্যমে বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করার সম্ভাবনা রয়েছে অনেক বেশি তারি উদ্দেশ্য হিসেবে আমরা দেখতে পাচ্ছি ভারতের পররাষ্ট্র সচিবসহ কয়েকজন মায়ানমারে যেয়ে সাবমেরিন বিক্রি করছে বাংলাদেশকে শিক্ষা দেওয়ার জন্য এটাকেও আমাদের স্মরণ রাখতে হবে।
বাংলাদেশের থিং টেংরা যদি এই মুহূর্তে আমেরিকার ইন্দো-প্যাসিফিক জোট ও চায়নার ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড এই দুই জোটকে সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারে তাহলে দ্রুতই বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অবকাঠামো উন্নয়ন করা সম্ভব এবং আমরাও তাকিয়ে রইলাম এদেশের রাজনীতিবিদদের দিকে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

About Company

Subscribe Newsletter

Sign up for our latest news & articles. We won’t give you spam mails.